কিসের দহনে বাকরুদ্ধ হন কবি নজরুল

ফুলের জলসায় নীরব কবি। কী কারণে কবি নজরুল বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন? এ নিয়ে বিতর্ক ব্রিটিশ শাসনকাল ১৯৪২ সাল থেকে। ’৪২ সালের ১০ জুলাই কবি হঠাৎ কথা বলা বন্ধ করে দেন। বিশ্রাম ও চিকিৎসার জন্য ২০ জুলাই কবিকে নিয়ে যাওয়া হয় বিহারের মধুপুরে। সবাই ভাবলেন কবি ঠিক হয়ে যাবেন। না, কবি ঠিক হননি। ফিরে আসেন কলকাতায়। এ নিয়ে কবির প্রিয়ভাজন সওগাত সম্পাদক নাসিরউদ্দীন তার আত্মকথায় নিউরো সার্জন ড. অশোক কুমার বাগচীর কথা লিখেছেন। আর ড. বাগচীর মতামত ছিল খোলামেলা। ড. বাগচীর মতে, নজরুলের অসুস্থতার লক্ষণ প্রথম যখন প্রকাশ পায় তখন বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বিশেষ করে তার স্ত্রী প্রমীলার অসুস্থতার পর কবি কিছু দিন কালী সাধনা করেছেন। গেরুয়া পোশাক পরতেন আর মাথায় ছিল একই রঙের টুপি। কবির এই চালচলন, বেশভূষাকে অনেকেই ধরে নেন মানসিক বৈকল্য হিসেবে। সেই সময় থেকেই কবির সুর-তাল ক্ষয়ে যেতে থাকে। গ্রামোফোন কোম্পানিতে গান গাওয়ার সময় তা প্রকাশও পেতে থাকে। কবি একটু-আধটু বেসুরো হতে থাকেন। অবশ্য ধরিয়ে দিলে সংশোধন হতে চেষ্টা করতেন। কিন্তু পুরোপুরি অসুস্থ হওয়ার পর তিনি সব কিছুর বাইরে চলে যান। এই সময় চশমাধারী কোনো মানুষকে দেখলে খেপে যেতেন। উত্তেজিত হতেন। এই কারণে ড. অশোক বাগচীর ধারণা ছিল, কোনো চশমাধারী ব্যক্তি কবির বড় ধরনের ক্ষতি করেছিল, যা তার মস্তিষ্কে স্থায়ীভাবে দাগ কেটে যায়। ড. বাগচী বিখ্যাত চিকিৎসক বিধান চন্দ্র রায়ের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেছেন, ‘স্নায়ুবিক বৈকল্য’ মতামতটাই যথার্থ। ১৯৫৩ সালে ভিয়েনার বিশ্বখ্যাত চিকিৎসকরা ‘স্নায়ুবিক বৈকল্য’ মতামতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করলেন। তারা বলেছিলেন, ১৯৩৯ সাল থেকে কবির সঠিক চিকিৎসা হলে তিনি বাকরুদ্ধ থাকতেন না। সঠিকভাবে তার চিকিৎসা হয়নি। শেষ পর্যন্ত ড. বাগচীরও একই মত। ভিয়েনার চিকিৎসকরা আরও বললেন, ১৯৫৩ সালে এসে নজরুল চিকিৎসা বিজ্ঞানের বাইরে চলে যান। তখন আর কিছু করার নেই চিকিৎসকদের।

মাঝে মাঝে আমিও ভাবী কী এমন মানসিক দুঃখ ছিল যার কারণে কবি নজরুল ভেঙে খানখান। হয়ে যান নীরব, নিস্তব্ধ। প্রেম এবং দ্রোহে নজরুলের কোনো তুলনা ছিল না। তার এক হাতে ছিল বাঁশের বাঁশি, আরেক হাতে রণতূর্য। অজানা পথিকের সন্ধানে কবির দিন কাটত। রাত কাটত। আগলে রাখতেন নিজের কষ্টগুলোকে। কাউকে বুঝতে দিতেন না। তবে সব কিছুর প্রকাশ ঘটাতেন গানে, কবিতায়। সুরের ঝঙ্কার তুলতেন নিজের অথবা অপরের কণ্ঠে। চেষ্টা করতেন কাঠিন্যকে জয় করতে। তাই তো কারাগারকে পরিণত করেছিলেন সৃষ্টিশীলতায়। বেদনাকে দ্রোহে রূপান্তর করেন। বঞ্চনাকে ঠাঁই দেন হৃদয়ের গহিনে। আহারে যদি জানা যেত মানুষের প্রতি কতটা অভিমানে কবি বলেছিলেন, ‘সত্য হোক প্রিয়া, দীপালি জ্বলিয়া ছিল-গিয়াছে-গিয়াছে নিভিয়া!’ কতটা যন্ত্রণায় ‘ফুলের বুকে দোলে কাঁটার অভিমানের মালা/আমার কাঁটার ঘায়ে বোঝ আমার বুকের জ্বালা।’ আহারে মানুষের জীবনটা বড় অদ্ভুত। মানুষ নিজেও জানে না তার ঠিকানা, তার যাতনা, বঞ্চনা। কবিগুরুর কথায়, জেনেশুনেই বিষপান। না জানি কতটা যন্ত্রণায় নজরুল চিরতরে বাকরুদ্ধ হয়ে যান। কী এমন হয়েছিল, যা তার বাকি জীবনটাকে তছনছ করে দিয়েছিল। সৃষ্টিশীলতা থেকে আড়াল করে দিয়েছিল কবিকে। মানুষের জীবন এত কষ্টের কেন হয়? কেউ কেউ দুঃখকে বিলাস মনে করে। আবার সত্যিকারের দুঃখ নিয়েই অনেক মানুষ একটা জীবন কাটিয়ে দেয় সৃষ্টিশীলতায়। কাউকে বুঝতে দেয় না। সমাজ, সংসার, প্রিয় মানুষ কেউ কাউকে বোঝে না।

শামসুর রাহমানকে কাছ থেকে দেখেছিলাম। আশির দশকে কবি তল্লাবাগে থাকতেন। সোবহানবাগ কলোনি পার হয়েই তল্লাবাগ যেতাম। আমার জীবনে অনেক মানুষ দেখেছি, মিশেছি, কিন্তু কবি শামসুর রাহমানের মতো এত ভালো মানুষ কাউকে দেখিনি। মানুষের দেওয়া কষ্টে কবি জর্জরিত হতেন। হতাশা, বেদনা, ক্ষোভ নিয়ে বসে থাকতেন। আমি যেতাম। অনেকে যেতেন। তখনকার তরুণ কবিদের মধ্যে মারুফ রায়হানকে নিয়মিত পেতাম। কবি তার কষ্ট শেয়ার করতেন। ক্ষোভ ও বেদনার কথা বলতেন। ভালোবাসার কথাও বাদ যেত না। সেই সময়ে কবিকে যে মানুষগুলো কষ্ট দিয়েছিলেন, তারাই আজ কবির কথা বলে কেঁদে ফেলেন। বড় অদ্ভুত এই সমাজ। একদল মানুষের কাজ সৃষ্টি করা। আরেক দলের কাজ সৃষ্টিশীল মানুষগুলোকে যন্ত্রণায় রাখা। মানুষের এই বহুরূপী নৃশংসতা নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের অনেক লেখা আছে। হুমায়ূন এক উপন্যাসে লিখেছেন, গল্পের নায়িকা আয়না মানুষের মনের কথা জেনে যেত তার বিশেষ ক্ষমতাবলে। মিসির আলির প্রশ্নের জবাবে একবার আয়না বলল, স্যার সব মানুষের মনের ভিতর ঢুকতে চাই না। কারণ বেশির ভাগ মানুষই কুিসত চিন্তা করে। উপন্যাসের কথা নয়, বাস্তবেও তাই। মানুষের বড় অংশই অন্যের ভালো দেখতে চায় না। সারাক্ষণ মাথায় চিন্তা লালন করে কীভাবে অন্যের ক্ষতি করা যায়। মানুষের ভালো-মন্দ দুটি কথার বিশ্লেষণ আছে, লেখনীতেও। অনেক বিশ্লেষণ রয়েছে শেকসপিয়রের হ্যামলেটে। পিতার মৃত্যুর পর হ্যামলেট ভেঙে পড়েন। এ সময় হ্যামলেটের ঘনিষ্ঠ দুই রাজপ্রহরী দেখতে পায় প্রয়াত রাজার ছায়ামূর্তিকে। এই রাজাই হ্যামলেটের বাবা। যিনি কিছু দিন আগে গত হয়েছেন। মৃত্যুর পর প্রচার করা হয়, বাগানে ঘুমিয়ে থাকার সময় সাপের কামড়ে তার মৃত্যু হয়েছে। শোকাহত হ্যামলেট প্রেতমূর্তির কথা জানতে পারেন। এক গভীর রাতে হ্যামলেট দুই প্রহরীর সঙ্গে মুখোমুখি হন ছায়ামূর্তির। হ্যামলেট মূর্তির পিছু পিছু দৌড়ে জানতে পারেন, এক কঠিন সত্য। মূর্তি তাকে জানায়, সাপের বিষে নয়, পরিকল্পিতভাবে বিষপানে তাকে হত্যা করা হয়েছে। কাজটি করেছেন হ্যামলেটের চাচা, যিনি এখন নতুন রাজা। একই সঙ্গে শোকের ছায়া কাটার আগেই বিয়ে করেছেন হ্যামলেটের মাকে। মৃত রাজার ছায়ামূর্তি পুত্রকে সব ঘটনা জানিয়ে নির্দেশ দেয় প্রতিশোধ নেওয়ার। তবে সাবধান করে দেয়, বিপথগামী মায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিতে। তাকে হত্যা না করতে। কারণ হ্যামলেটের বাবা তার দ্বিচারিণী স্ত্রীকে গভীরভাবে ভালোবাসেন।

ক্ষুব্ধ হ্যামলেট বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার সংকল্প নেয়। কিন্তু মাকে হত্যা করতে পারে না। কারণ তার বাবার প্রেতাত্মা না করেছে। তবু মাকে ছাড় দেয় না। কথার আক্রমণে মাকে জর্জরিত করে। আত্ম দংশনের জন্য বাঁচিয়ে রাখে নিজের মাকে। ক্ষমতা দখলকারী চাচাসহ অন্যদের হত্যা করে শোধ নেয় হ্যামলেট। হত্যার সেই নিষ্ঠুরতা নিয়ে নয়, মানুষ সম্পর্কে হ্যামলেটের মূল্যায়ন আমাকে ভাবিত করে। হ্যামলেট মানুষের দুটি অংশ দেখতে পান। তার চোখে মানুষের মূল্যায়ন অনেকটা এমনই— মানুষ কী অনবদ্য সৃষ্টি, বুদ্ধি বিবেচনায় কেমন মহৎ, মানসিক শক্তিতে অনিঃশেষ আকারে-আচরণে বিস্ময়কর, কর্মে দেবদূত, প্রাণীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তবুও সেই মানুষ আমার কাছে ধূলিকণার ভিতরকার একটি কণা ভিন্ন অন্য কিছু নয়। পবিত্র কোরআনেও মানুষকে একদিকে সৃষ্টির সেরা হিসেবে বলা হয়েছে। আবার মাটি দিয়ে বানানো খুবই সাধারণ হিসেবে বর্ণনা আছে। বাস্তবেও মানুষ একদিকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ, অন্যদিকে কিছুই না। বাস্তবতা এমনই। সেদিন একটি টেলিভিশনে অনুষ্ঠান দেখছিলাম। এক জংলির ওপর খুশি হয়ে বনের সর্দার জানতে চান কী চাও আমার কাছে? যা চাও তাই পাবে। জবাবে জংলি জানায়, মানব সমাজে যেতে চাই। শহরের সভ্যতা দেখতে চাই। সঙ্গে সঙ্গেই সে সর্দার প্রস্তাব পাস করলেন। বনের জংলিকে পাঠালেন শহর দেখতে। মানব সমাজের সভ্যতা দেখে ঘোর লেগে যায় বনের জংলির। রাজশাহী গিয়ে দেখতে পায়, শিক্ষককে অকারণে জবাই করা হচ্ছে। সিলেটে দেখল পিটিয়ে শিশু রাজনকে খুন করা হচ্ছে। এরপর এই খুনের ছবি আপলোড করা হয় সামাজিক গণমাধ্যমে। খুলনায় আরেক শিশুকে খুন করা হয় মেশিন দিয়ে পাম্প করে পেটে গ্যাস ভরে। এসিড ছুড়ে মারা হয় নিরীহ নারী-শিশুদের ওপর। মানুষ খাবারে ভেজাল মেশাচ্ছে। ওষুধে ভেজাল মেশাচ্ছে। চারদিকের ভয়ঙ্কর সব নিষ্ঠুরতা দেখে বনের জংলি চিৎকার করতে থাকে আমি কোথায় এলাম। আমাকে আবার বনে ফিরিয়ে নাও।

মানুষের মানবিক মূল্যবোধগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে। নীতি ও নৈতিকতা বলে কিছু নেই। বাঁশ দিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান নির্মাণের খবর দেখলাম পত্রিকায়। মাঠ পর্যায়ের একজন প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে কথা হচ্ছিল। বলে রাখা ভালো, আমার কাছে কুমিল্লা ও নাঙ্গলকোটের আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও মাঝে মাঝে আসেন। গল্প-গুজব করেন। সুখ-দুঃখ শেয়ার করেন। কী কারণে যেন বিভিন্ন জেলা থেকেও অনেক রাজনৈতিক নেতা আমার কাছে আসেন। সেদিন এক প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা বললেন, হাইব্রিড, নবাগত, বহিরাগতদের যন্ত্রণায় মাঝে মাঝে মনে হয় রাজনীতি ছেড়ে দিই। আমি বললাম কেন? বললেন, টেলিভিশন খুললে টকশো দেখে মেজাজ খারাপ হয়। এত আওয়ামী লীগ আমরা কোথায় রাখব জানি না। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগেও আওয়ামী লীগের যারা সমালোচনা করতেন এখন তারা কড়া আওয়ামী লীগার। তাদের বক্তব্যের সময় অনেকে ইচ্ছা করলে তেলের বাটি টিভি সেটের নিচে রেখে দিতে পারেন। পুরো এক সপ্তাহ আর তেল কেনা লাগবে না। কেন তারা এমন করছেন? ভয়ঙ্কর খবর। চাওয়া-পাওয়ার লোভেই এই মানুষগুলোর বদলে যাওয়া। কঠিন বাস্তবতা। দেশটা এখন তেলে ভাসছে। তেলের পরিমাণ দেখে আমার ভয় লাগছে। কারণ অতি তেলে সবকিছু পিছলা হয়ে ওঠে। তখনই হোঁচট খাওয়ার ভয় থাকে। তেলবাজদের দরকার নেই। দরকার সত্যিকারের সমালোচকদের। যারা সরকারকে পথ দেখাবে। সব ব্যাপারে আহ বেশ বেশ বলবে না। আবার অকারণে সমালোচনাও করবে না। ভালোকে ভালো, মন্দকে মন্দ বলবে। সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলবে। তোষামোদকারীদের নিয়ে উৎকণ্ঠায় আছি। কারণ সরকার কোনো কারণে হোঁচট খেলে এই তোষামোদকারীদের খুঁজে পাব না। ’৯১ সালে নির্বাচনের পরের চিত্র মনে আছে, ২০০১ সালের কথাও ভুলিনি। ওয়ান-ইলেভেনের সময়কার কথাও কারও অজানা নয়। সুতরাং সময় থাকতে সাধু সাবধান। তোষামোদকারী অতি উৎসাহীদের খেদাও আন্দোলন ত্যাগী নেতা-কর্মীদেরই করতে হবে। সত্যিকারের খাঁটি আওয়ামী লীগারদের দেখতে চাই নেতৃত্বে, সরকারে। নবাগত, বহিরাগত, হাইব্রিডরা সবসময় হয় ভয়াবহ। কিছু লোক বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে অতি বিএনপি হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে অতি আওয়ামী লীগ হয়ে যায়। সমস্যা অতিদের নিয়েই। এই সুযোগ সন্ধানীদের সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে দেশবাসীকে।