তিনি বললেন, আমি এখন আওয়ামী লীগ নেতা

naem nizamকিছু দিন আগে ফোন করেছিলেন বিএনপি নেতা মিজানুর রহমান মিনু। তিনি রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র। কথা হলো তার সঙ্গে। বললেন, রাজশাহীর বিএনপি নেতা-কর্মীদের ধমক দিয়ে আওয়ামী লীগে নেওয়া হচ্ছে। তাদের বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগে আস মামলা প্রত্যাহার হবে। মামলার পাহাড়ে থেকে লাভ নেই। শুধু আওয়ামী লীগের নেতারা নন, প্রশাসন বিশেষ করে পুলিশও এই প্রক্রিয়াতে নিজেদের জড়িয়ে নিয়েছে। তিনি দুঃখ করলেন, রাজশাহীর পুলিশের বড় কর্তাদের নিয়ে। মিনুর বক্তব্যের পর খোঁজখবর নিলাম। যোগদানের হিড়িক শুধু রাজশাহী নয়, সারা দেশেই কমবেশি। বিএনপি নেতা ও সাবেক মন্ত্রী-এমপিরা এখন মহাটেনশনে তাদের কর্মী ধরে রাখা নিয়ে। গুজব আর হিড়িক এক ধরনের রোগের মতো। একবার শুরু হলে চলে অনেক দিন। আমার নিজের বাড়ি কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলায়। বছরখানেক আগে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নূর উল্লাহ মজুমদার আওয়ামী লীগে যোগ দেন। আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে তিনি ফোন করলেন আমাকে। বললেন, ভাই আমি এখন আওয়ামী লীগ নেতা। তারও আগে নাঙ্গলকোটের পৌর জামায়াতের আমির যোগ দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগে। এভাবে যোগদানের হিড়িক চলছে দেশজুড়ে। বিএনপির মাঠের নেতা-কর্মীদের নতুন বিনোদন আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ কর্মীরা মজা নিচ্ছে। দেশজুড়ে চলছে যোগদান অনুষ্ঠান। বিএনপি-জামায়াত কর্মীরা দলেবলে যোগ দিচ্ছে আওয়ামী লীগে। সবচেয়ে বেশি হচ্ছে দেশের উত্তরাঞ্চলে।

আওয়ামী লীগে এখন বিএনপির যোগদান নিয়ে মহাভারতের একটা কাহিনী মনে পড়ছে। পঞ্চবটী বন থেকে ছলনা করে সীতাকে শক্তি প্রয়োগে হরণ করার সময় রাবণকে বাধা দেন জটায়ু। আকাশপথে সীতাকে নিয়ে যাওয়ার সময় রাবণের পথরোধ করে বলেন, ‘চিনি তোরে… চোর তুই, লঙ্কার রাবণ।’ এই ধিক্কার সীতাহরণের মতো অপকর্ম করার জন্য। রাবণ চরিত্রের এই কলঙ্কময় দিকটি প্রকাশ করার জন্য এই সংলাপ মাইকেল মধুসূদন দত্ত লিখেছিলেন তার মেঘনাদবধ কাব্যে। সীতাহরণ যে ঘোরতর অন্যায় এবং এই চৌর্যবৃত্তি রাবণের জন্য কলঙ্ক। অথচ রাজা রাবণ সীতাহরণকে কখনোই চৌর্যবৃত্তি বলে বিবেচনা করেননি। অপমানিত বোনের অনুরোধে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য সীতাহরণ অন্যায় হতে পারে না- এই-ই রাবণের ধারণা। কিন্তু জটায়ুর উক্তিতে রাবণের প্রতি সাধারণের ধারণা প্রতিফলিত অন্যভাবে। গতানুগতিক ধ্যানধারণায় রাবণের অপরাধ যে কত বড় তা সবাই জানি।

আওয়ামী লীগ একটি বিশাল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। এই দলটির সঙ্গে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী আর বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। আওয়ামী লীগ সব সময় ত্যাগী নেতা-কর্মীদের প্রতিষ্ঠান। অনেক দুঃসময় পাড়ি দিয়েছে দলটি। আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যের সঙ্গে অন্য কোনো কিছু মেলানো যায় না। এখনো মাঠের কর্মীরা স্বার্থের বাইরে গিয়ে কাজ করছে দলের জন্য। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে সুবিধাবাদীরা এলাকা ছাড়া ছিল। অনেক মন্ত্রী-এমপি এলাকায় যাননি। যারা গিয়েছিলেন তাদের ঢাকা ফিরতে হয়েছিল র্যাবের সহায়তা নিয়ে। কিন্তু সত্যিকার কর্মীরা এলাকা ছাড়েননি। তারা মাঠ অাঁকড়ে ছিলেন। হামলার শিকারও হয়েছিলেন। ২০০১ সালের পর দেখেছিলাম আওয়ামী লীগ কর্মীদের দুঃখ-কষ্ট। ঝিনুকের মতো নীরবে তারা কষ্ট সয়ে টিকে ছিলেন। সেই নেতা-কর্মীদের বেশির ভাগ গত ছয় বছরে মূল্যায়ন পাননি। অবহেলা-বঞ্চনা এখনো অনেককে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। আওয়ামী লীগে সুবিধাবাদীদের জয়জয়কার চলছে। নিজের স্বার্থে টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি আর দখলবাজি দলের দুর্নাম করছে। এই আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ নয়। আওয়ামী লীগ করতে হলে আগে বঙ্গবন্ধুকে জানতে হবে। ইতিহাসের মহানায়কের আত্মজীবনী পড়তে হবে। শিক্ষা নিতে হবে বঙ্গবন্ধুর জীবনী থেকে। তার কন্যার সততা, ত্যাগ ও নিষ্ঠা থেকে।

আওয়ামী লীগে নবাগতদের জন্য আমার শুভ কামনা। কিন্তু এই দল বড় কঠিন। এই কাঠিন্য নতুনরা কতটা ভেদ করতে পারবেন জানি না। তবে সাবধানে তাদের পথ চলতে হবে। অন্যথায় হোঁচট খেতে হবে। তবে আমি মনে করি আওয়ামী লীগে নতুন কাউকে দরকার নেই। আওয়ামী লীগকে তার নিজস্ব গতিতে রাখাই ভালো। ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন করা জরুরি। দলের জন্য ভূমিকা পালনকারী প্রতিটি কর্মীকেই মূল্যায়ন করতে হবে। সুবিধাবাদী নেতারা ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন না করলে দলে শূন্যতার সৃষ্টি হবে। সুবিধাবাদীরা কখনোই কোনো দলের জন্য মঙ্গল বয়ে আনেন না। তারা সাময়িকভাবে একটি দলের জন্য কাজ করেন। অতি উৎসাহী ভূমিকা নিয়ে দলের সর্বনাশ করেন। তারপর দুঃসময়ে কেটে পড়েন। অতীতে তা-ই প্রমাণ হয়েছে বারবার। তাই আমি মনে করি দরকার নেই ঝাঁকে ঝাঁকে বিএনপি-জামায়াত নেতা-কর্মীদের দলে ভেড়ানোর। আওয়ামী লীগকে চালাতে হবে তার মতো করে। এই দলের বিশাল নেতা-কর্মী শুভানুধ্যায়ী গ্রুপ রয়েছে। প্রয়োজনে অভিমানী নেতা-কর্মীদের বের করে আনতে হবে। তাদের মূল্যায়ন করতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য কমিয়ে মন্ত্রী, এমপি, নেতাদের মনোযোগ দিতে হবে দলের দিকে। সারা দেশে দলে এক ধরনের স্থবিরতা চলছে। যে কোনো মূল্যে কাটিয়ে উঠতে হবে এই স্থবিরতা। কারণ আগামীর কথা ভাবতে হয় ভালো সময়ে।

আওয়ামী লীগের একজন নেতা কথায় কথায় বললেন, আপনি বিএনপি কর্মীদের যোগদান নিয়ে অনেক কথা বলছেন। কিন্তু তারা কেন যোগ দিচ্ছে একটু অনুসন্ধান করুন। আমি বললাম, আমাদের আশাবাদ আওয়ামী লীগের কাছে। বিএনপির কাছে নয়। কারণ বিএনপি হলো বারোভূতের সুবিধাবাদীদের একটি দল। এই দলের নেতা-কর্মীরা ক্ষমতায় থাকার সময় অর্থবিত্ত অনেক কামিয়েছেন। তাই তাদের এখন কোনো ঝুঁকিতে যাওয়ার সাহস নেই। আন্দোলন ডেকে তারা মাঠে আসেন না। সাহস করে নিজের বাড়ি থেকেও আটক হন না। লুকিয়ে থাকেন। বিএনপির নেতা-কর্মীরা মনে করছেন, তাদের দলের আবার ক্ষমতার রাজনীতিতে ফিরতে সময় লাগবে। এত অপেক্ষা করে কী লাভ? তার চেয়ে নগদ নারায়ণ লাভের সুযোগ এসে গেছে। এই সুযোগকে কাজে লাগানোই ভালো। বিএনপি ভুলের সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছে। ক্ষমতার রাজনীতিতে আসতে হলে বিএনপিকে আরও অপেক্ষা করতে হবে। ক্লিন করতে হবে দলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। ত্যাগী নেতা-কর্মীদের সামনে আনতে হবে। ভুলে যেতে হবে অতীতের অনেক কিছু। কূটনীতি নিয়ে ভাবতে হবে নতুন করে। প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভেতরে এক, বাইরে আরেক নীতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। বুঝতে হবে প্রতিবেশীর সঙ্গে মানুষ যুদ্ধ চায় না। শান্তি চায়।

নোবেল পুরস্কার গ্রহণ অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ তাঁর আবেগঘন ভাষণে বলেছিলেন, ‘আমাদের আরও গভীরে যেতে হবে। আমাদের আবিষ্কার করতে হবে ঐক্যের কোনো গভীরতম ভিত্তি, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে যা আত্মিক ঐক্য গড়ে দেবে। মানুষের চেতনার গভীরে আমাদের অনুসন্ধান করতে হবে, খুঁজে বের করতে হবে মানব জাতির সব ধরনের জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে মহান ঐক্যের কোন ধরনের বন্ধন কার্যকর। আর এই কর্তব্য সম্পাদনের যথার্থ যোগ্যতা আমাদের রয়েছে। আমরা আমাদের পূর্ব পুরুষদের অবিনশ্বর কৃতির উত্তরাধিকারী, সেসব মহান ঋষি যারা ঐক্য আর সংবেদনের ধর্ম প্রচার করে ঘোষণা করেছিলেন : যে সর্বভূতকে আত্মবৎ উপলব্ধি করে, সে-ই যথার্থ সত্যদ্রষ্টা। শুধু প্রাচ্যের সন্তানদের নয়, পাশ্চাত্যের সন্তানদেরও এই সত্য উপলব্ধি করতে হবে। তাদের আবার সেই মহৎ অমর সত্যগুলো স্মরণ করিয়ে দিতে হবে।’

প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের আরও অনেক গভীরে যেতে হবে। আবেগতাড়িত হয়ে চললে হবে না। প্রয়োজনে এ বিষয়ে দলমত নির্বিশেষ সবাইকে বসতে হবে। কথা বলতে হবে। এখনো আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেয়। সীমান্ত চুক্তি নিয়ে নরেন্দ্র মোদি কথা বলেছেন সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে। বৈঠক করেছেন মমতা ব্যানার্জিসহ অনেকের সঙ্গে। মোদি পররাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা রক্ষা করছেন মনমোহন সিংহের। ভারত পারলে আমরা পারব না কেন? আমাদেরও সময় এসেছে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে একমত থাকা। সরকার বদল হতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ে নীতি থাকবে এক এবং অভিন্ন। সময়ের কারণে অনেক কিছু বদল হতে পারে, কিন্তু কাঠামো থাকতে হবে অভিন্ন। কারণ বন্ধু বদল করতে পারি, প্রতিবেশী বদলানো সম্ভব নয়। আমাদের চারপাশ ঘিরে যে দেশটি তার সঙ্গে সম্পর্ক অবশ্যই ভালো থাকবে। তবে সম্মান ও মর্যাদা ধরে রেখে। আমরা বন্ধু চাই। বড় ভাই নয়।