ভোট জালিয়াতি কেন হয় কীভাবে হয়

naem nizam:: নঈম নিজাম
ভোট এক জটিল বিষয়। কবি নজরুল একবার ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন। সময়টা পুরো মনে নেই। আনুমানিক ১৯২৬ থেকে ৩০ সালের দিকের ঘটনা। কিন্তু একজন জমিদারের বিরুদ্ধে ভোট করে কবি কাঁপিয়ে দিলেন ফরিদপুর। হারলেন অতি অল্প ভোটে। এ পরাজয়ের পর বিদ্রোহী কবি আর ভোটমুখী হননি। আমার আরেক প্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণও ভোট করেন একবার। তার মার্কা ছিল কুমির। কুমির নিয়ে কবি নেত্রকোনার নির্বাচনী এলাকা চষে বেড়ান। ঢাকা থেকে কবিভক্তরা নেত্রকোনা যান দলেবলে। আমারও যাওয়ার কথা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যাওয়া হয়নি। তার পরও নেত্রকোনায় ভোট উৎসবের শেষ ছিল না। হুমায়ূন আহমেদ গিয়ে এ উৎসব আরও জমিয়ে দেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভোটাররা কথা রাখেননি। তারা আওয়ামী লীগ, বিএনপি প্রার্থীর বাইরে যাননি। কথা দিলেও তারা ভোট দেননি কবি নির্মলেন্দু গুণকে। লেখক, সাহিত্যিকদের ভোটের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। ভোটের হিসাব-নিকাশটাই অন্য রকম। সৃষ্টিশীল মানুষরা এত হিসাবি নন। রাজনীতির মারপ্যাঁচও তারা ধরতে পারেন না। যে কারণে রাজনীতিতে গিয়ে বিপদে পড়েন। ভোট হলো পার্টি ক্যাডারদের জন্য। জিয়াউর রহমানের আমলে দেশে একবার ‘হ্যাঁ-না’ ভোট হয়েছিল। আমাদের স্কুলপড়ুয়া বন্ধুরা পরদিন এসে গল্প শোনাল কে কত শত ভোট দিয়েছে। আসলে ভোট দেওয়া নয়, সিল মারা। ভোটাররা কেন্দ্রে যাননি। প্রিসাইডিং অফিসাররা বসে থাকতে পারেন না। তিনি স্কুলপড়ুয়া ছেলেদের ডেকে সিল মেরে বাক্স ভরিয়েছেন।

ভোট জালিয়াতি আরও অনেক দেখেছি। পেশাগত কারণে অনেক কিছু প্রত্যক্ষ করেছি। একবার কুমিল্লার এক কেন্দ্রে দেখলাম বিশাল লাইন। দাঁড়িয়ে আছেন ভোটাররা। রাস্তায় সেনা টহল। পুলিশসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন বসে আছেন। ভিতরে গিয়ে দেখি পোলিং এজেন্ট আর প্রিসাইডিং অফিসার মিলেঝিলে সিল মারছেন। পরে আবিষ্কার করলাম, বাইরের লাইনে থাকা মানুষগুলো তাদের সমর্থক। কোনো সমস্যা নেই। সাধারণ মানুষের পক্ষে কোনো কিছু বোঝা সম্ভব নয়। ভোট নিয়ে আরেক অভিজ্ঞতা কাদের সিদ্দিকীর আওয়ামী লীগ ছেড়ে উপনির্বাচনে অংশ নেওয়ার সময়কার। আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ এমপিরা সখীপুর গিয়ে অবস্থান নেন। ডাকসাইটে এমপিরা দায়িত্ব নেন বিভিন্ন কেন্দ্রের। প্রিসাইডিং অফিসার রাতেই ম্যানেজ। পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা পেলেন নগদনারায়ণ। মাঝরাতেই ১০ থেকে ২০ শতাংশ ভোট পড়ে বাক্সে। কাদের সিদ্দিকীর কাছে অভিযোগ আসে দিনের বেলায়। অভিযোগ কেন্দ্রে গিয়ে ভোটাররা ফিরে আসেন। কারণ তাদের ভোট অন্যজন দিয়ে দিয়েছেন। তারা জানতে পারলেন না, দিনে নয়, সেই ভোটারদের ভোট রাতেই শেষ। কেউ কিছু ধরতে পারলেন না।

ভোটের আরেক ইতিহাস ২০০১ সালে। সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের বাড়িতে হামলা ভোটের দুই দিন আগেই শুরু। পুলিশ প্রশাসন নগদে ম্যানেজ। সর্বশেষ বিদায়ী সরকারের প্রতি প্রশাসনের এক চুলও দরদ নেই। রাতের ব্যবধানে তারা চোখ উল্টিয়ে নেয়। আমার থানা নাঙ্গলকোটের পুলিশের এক দারোগার দাপট দেখেছি। তার কাজ ছিল আওয়ামী লীগারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হামলা করা। তিনি লিডার। সঙ্গে শুধু পুলিশ নয়, খোলা অস্ত্র নিয়ে শিবির ও বিএনপি ক্যাডাররা। ভোটের আগেই কেন্দ্রছাড়া আওয়ামী লীগের কর্মীরা। ঘোড়াময়দান নামের এক কেন্দ্রে বিএনপি পায় ৬ হাজার ৬০০ ভোট আর আওয়ামী লীগ ১২ ভোট। এই সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আওয়ামী লীগ সমর্থক সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অনেক এলাকায় হামলা হয়নি। তবে তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল কেন্দ্রে যাওয়ার দরকার নেই। আপনার ভোট আমরা পেয়ে গেছি। ধানের শীষের প্রতি আপনাদের ভালোবাসায় আমরা মুগ্ধ। কেন্দ্রে কষ্ট করে কেন যাবেন? আপনাদের এ ভালোবাসার কথা মনে থাকবে। ভোটের পর দিন শান্তিতে ছিলেন না আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। তাদের বাড়িঘর লুট হয়েছিল। ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে খোলা হয়েছিল লঙ্গরখানা। বরিশাল, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট থেকে পালিয়ে নিরীহ মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন কোটালীপাড়ার স্কুলঘরগুলোয়। সেখানেও লঙ্গরখানা খোলা হয়।

ভোটের সর্বনাশ আর গণতন্ত্রের হার যুগে যুগে হয়েছে। এখনো হচ্ছে। আমরা এই রাহু থেকে মুক্ত হতে পারছি না। কবে মুক্ত হব তা-ও জানি না। ভালো কিছুর আশা করি সবসময়। এবারও আশা করেছিলাম। কিন্তু আমি ঢাকা সিটি করপোরেশনের ভোটার নই। কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের ভোটার। আমার স্ত্রী ঢাকার ভোটার। সিটি নির্বাচনে তার সঙ্গে গেলাম উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরের হাইস্কুল কেন্দ্রে। তিনি ভোটার। পাশে আমি পর্যবেক্ষক (কার্ড ছিল নির্বাচন কমিশনের)। তার পরও ভিতরে থাকলাম না। তাকে কেন্দ্রের ভিতরে পাঠিয়ে স্কুল গেটের কাছে দাঁড়ালাম। সাধারণ ভোটাররা আমার কাছে এসে টুকটাক গল্প করছেন। বিএনপির দুই সমর্থকের সঙ্গে কথা হলো। একজন বললেন, ভাই দেখুন চারদিকে শুধু আওয়ামী লীগের লোক ব্যাজ পরে ঘুরছে। বিএনপির পোলিং এজেন্ট নেই। বিএনপির লোকজন দাঁড়াতে পারছে না। বিএনপির আরেক নারী সমর্থক বললেন, বাস মার্কায় ভোট দিলাম। কিন্তু মন ভালো নেই বিএনপির কর্মীরা নেই বলে। আমি জানতে চাইলাম, সমস্যা কোথায়? তারা কোথায়? তিনি বললেন, সমস্যা রাত থেকেই। পোলিং এজেন্টদের হুমকি দিয়ে আসতে দেওয়া হয়নি। তাকে বললাম, সকালে দলে বলে এলেই হতো। অনেক মিডিয়া আছে এখানে। টেলিভিশনগুলোর লাইভ ক্যামেরা নিয়ে রিপোর্টাররা ঘুরছেন। তারা দুই পক্ষের তর্কাতর্কি দেখতে চান। অভিযোগ শুনতে চান। কেন্দ্রে সাহস করে এলেই ভালো হতো। ভদ্রমহিলা আর কথা বাড়ালেন না। বিপক্ষের লোকজনকে হুমকি আমাদের দেশে পুরনো সংস্কৃতি। কেন্দ্রে আসতে বাধা দেওয়া আগেও দেখেছি। কিন্তু বিপক্ষের লোকজন সবসময় সতর্ক থাকেন। তারা কেন্দ্র পাহারা দেন। নেতা-কর্মীরা কষ্ট করে মাঠ ধরে রাখেন। ঝুঁকি নেন। কিন্তু এবার তা দেখিনি। বিএনপির কর্মীরা ঝুঁকি নেননি। হুমকির কাছে মাথা নত করেছেন। কারণটা কী?

আমার মনে হচ্ছে, সহিংস রাজনীতিই বিএনপির সর্বনাশ ঘটিয়েছে। বিএনপি আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টি নয়। গণমানুষের সঙ্গে দলটির সম্পর্ক আছে। বর্জনের পরও তিন সিটির ফলাফলে তা-ই মনে হচ্ছে। তিন মাসের সহিংস রাজনীতির কারণে বিএনপির ঢাকা ও চট্টগ্রামের নেতা-কর্মীদের বড় অংশ এখন ফেরারি। মাঠের কর্মীরা সক্রিয় ছিলেন না এ নির্বাচনে। ছাত্রদলের নব্বইয়ের এক ডাকসাইটে নেতার সঙ্গে কথা হচ্ছিল গতকাল। বললেন, ভাই বড় কষ্ট পেয়েছি ম্যাডামের গাড়িতে হামলা দেখে। কিন্তু তার পরও যাইনি। কারণ আমাদের মূল্যায়ন নেই। বেগম খালেদা জিয়া ভোটের প্রচারণায় বের হবেন এ খবর গোপন রাখা হয়েছিল। এ খবর গোপন থাকবে কেন? তিনি গণমানুষের নেত্রী। রাজপথে অতীতেও মাঠে ছিলেন। নেতা-কর্মীদের জানানো হলে রাস্তায় রাস্তায় তারা অবস্থান নিতেন। সাধারণ মানুষও উৎসাহ নিয়ে অপেক্ষা করত। মানুষের ভিড় থাকলে হামলাকারীরাও আসতে সাহস পেত না। অথচ ব্যক্তিগত স্টাফ সব গোপন রেখেছেন। এই দলের সিদ্ধান্ত কারা নেন, কে নেন, কীভাবে নেন কিছুই জানি না। এই নেতা আরও দুঃখ করে বললেন, আশির দশকের ছাত্রদল নেতাদের কোনো মূল্যায়ন নেই। আমি জানতে চাই, ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন আছে কি? তিনি বললেন, মোটেও না। আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর দিন শোক জানাতে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। ভিতরে ঢুকতে দিলেন না কর্মচারীরা। অথচ বিএনপির শীর্ষ নেতারা সবাই ভিতরে ছিলেন। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, নজরুল ইসলাম খান, আবদুল্লাহ আল নোমানসহ কোনো নেতাকে জানানো হয়নি বাইরে প্রধানমন্ত্রী দাঁড়িয়ে আছেন। সেই নেতারা পরে দুঃখ করেছেন এই দলে কী হয় কিছুই জানি না।

সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়েও বিএনপিতে নানামুখী বক্তব্য আছে। অনেকে বললেন, তিন মাসের সহিংস রাজনীতির বদনাম থেকে বের হওয়ার জন্যই বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেওয়া। জেতার জন্য অংশ নেয়নি। বিএনপি নেতা-কর্মীদের বড় অংশ এখন কারাগারে। সাবেক কাউন্সিলররা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এবার নির্বাচনে যারা অংশ নিয়েছিলেন তাদেরও কাজ করতে দেওয়া হয়নি। গত এক বছরের আন্দোলনে মহানগর কমিটির ব্যর্থতা ছিল। বিশেষ করে ঢাকা সিটির নেতাদের আন্দোলনে দেখা যায়নি। সাহস করে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নেতারা সিটি নির্বাচন নিয়ে ব্যাপকভাবে মাঠে নামেননি। তাদের মধ্যে নানামুখী সংশয় ছিল। এমনকি প্রার্থী হিসেবে মির্জা আব্বাসকে মাঠে পাননি কর্মীরা। আবদুল আউয়াল মিন্টু জনপ্রিয় প্রার্থী ছিলেন। তার ছেলের সঙ্গে নেতা-কর্মীদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। চট্টগ্রামে জনপ্রিয় প্রার্থী ছিলেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী অথবা আবদুল্লাহ আল নোমান। তারা ভোটে যাননি। আমাদের দেশে পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকলে মানুষের কাছে অপ্রিয় হতে হয়। মনজুর আলম গত পাঁচ বছর মেয়র ছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের সমস্যাগুলো মোকাবিলা করতে পারেননি সরকারের অসহযোগিতায়। জলাবদ্ধতা দূর করার ক্ষেত্রে তার ব্যর্থতা ছিল। এত সমস্যার পরও সাধারণ ভোটাররা বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল, যার প্রমাণ ভোটের দুপুর ১২টা পর্যন্ত ফলাফল।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে এক বন্ধু ফোনে বললেন, তাবিথ আউয়ালের ভোট দেখেছেন? দুপুর ১২টার আগে এত ভোট? বিএনপি ভোট বর্জন না করলে তার সম্ভাবনা ছিল। তিনি ভালো করতে পারতেন। আর প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে বিএনপির কর্মীরা শক্ত অবস্থান নিলে কথাই ছিল না। ভোট নিয়ে এদিক-ওদিক করা সম্ভব হতো না। অতীতেও ক্ষমতাসীনদের হারিয়ে বিরোধী দলের জয়ের অনেক দৃষ্টান্ত আছে। এবারও স্বাভাবিক রাজনীতি থাকলে বিএনপি আরও ভালো করত। আমি বন্ধুকে বললাম, আপনার সঙ্গে একমত। বিএনপির এখনো সমর্থক আছে, কিন্তু নেতা নেই। বিএনপি কারা চালান, কীভাবে চালান এ প্রশ্ন এখন মাঠের কর্মীদের। তার পরও আমি মনে করি বিএনপির হারানোর কিছু নেই। তারা সুস্থধারার রাজনীতিতে ফিরে এসেছে। এই ভোটে বাড়ি ফিরেছেন অনেক নেতা-কর্মী। কয়েক মাসের আন্দোলনের পর নতুন করে পথচলার একটা রাস্তার দরকার ছিল। বিএনপি সে রাস্তা ফিরে পেয়েছে সিটি নির্বাচনে অংশ নিয়ে। বর্জন না করে ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষা করলে হয়তো বড় চমকও থাকত। সেই চমক আর দেখা হলো না। তাই আপাতত শুধুই অপেক্ষা।

পাদটীকা : এক লোক ভোটে দাঁড়িয়েছেন। নাওয়া নেই, খাওয়া নেই। সারা দিন বাড়ি বাড়ি হেঁটে কেবলই ভোটের প্রচারণা। মাঝরাতে একদিন বাড়ি পৌঁছে দেখেন ঘরের দরজায় বউ দাঁড়িয়ে। সারা দিনের ক্লান্তিতে প্রার্থীর অবস্থা চরম খারাপ। এর মধ্যে যোগ হয়েছে পানির তৃষ্ণা। বউকে বললেন, এক গ্লাস পানি দেন মা। গিনি্ন খেপলেন। বললেন, মিনসের হয়েছে কী ভোটে দাঁড়িয়ে? বউকে ডাকছেন মা। প্রার্থী বললেন, তোমার মনে করার কিছু নেই। ভোটে দাঁড়ালে মাথা ঠিক থাকে না। তখন বউকে মা ডাকে। আর ভোটারদের ডাকে বাবা।