নতুন চ্যালেঞ্জ, নতুন অঙ্গীকারের আরেকটি বছর শুরু

naem nizam:: নঈম নিজাম
একজন পাঠক একটি সংবাদপত্রের কাছে কী আশা করে? সংবাদপত্রগুলো সেই আশাবাদ কতটা পূরণ করতে পারে? একজন সাংবাদিক কতটা স্বাধীন? মিডিয়ার ওপর খড়গ কতটা? আবার সাংবাদিকরা নিজেরাও দলীয় ও গোষ্ঠীগত চিন্তায় কতটা জড়িয়ে আছেন? এমন হাজারো প্রশ্ন পাঠকের। পাঠকের চিন্তা ও বাস্তবতার সমন্বয় করতে গিয়ে একজন সংবাদকর্মীকে সবসময় হিমশিম খেতে হয়। মিসৌরি স্কুল অব জার্নালিজমের শিক্ষক অধ্যাপক লরিকে একবার প্রশ্ন করেছিলাম, ইরাক ও আফগান যুদ্ধে মার্কিন মিডিয়ার একতরফা ভূমিকা কীভাবে দেখ? লরি জবাব দিয়েছিল, এই ভূমিকা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার জন্য অসম্মানজনক। মার্কিন সাংবাদিকদের চালু করা ‘এমবেডেড জার্নালিজম’ নিয়ে আবারও বললাম, তুমি দীর্ঘদিন সিএনএনের ডাকসাইটে রিপোর্টার ছিলে, ভিয়েতনাম যুদ্ধ কিংবা সোভিয়েত বিভক্তির সময় তোমাকে দেখেছি। দুনিয়া জুড়ে তোমার খ্যাতি। এমবেডেড জার্নালিজম কি মিডিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে না? লরি হাসল, বলল, তোমার সঙ্গে আমার দ্বিমত নেই।

মার্কিন সাংবাদিকদের বড় অংশই এমবেডেড জার্নালিজম সমর্থন করে না। তবুও বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ সাংবাদিকতায় একটি নতুন শব্দের জন্ম দিয়েছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, ব্রিটেনসহ অনেক গণতান্ত্রিক দেশের সাংবাদিকরা যুদ্ধের ময়দানে সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলেমিশে দায়িত্ব পালন করছেন। সেনাবাহিনী যা বলছে তা সম্প্রচার করছেন। যুদ্ধের গোলাগুলি দেখাচ্ছেন। কিন্তু এতে অন্য দেশের মানবাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কিনা অথবা এর শেষ পরিণতি কী দাঁড়াতে পারে তা নিয়ে মুখ খুলছেন না। কোনো কিছু লিখছেন না। সম্প্রচার করছেন না কোনো সংবাদ। পশ্চিমা মিডিয়ার এই নীতিমালার কারণে আফগান ও ইরাক যুদ্ধের সময় বাজিমাত করেছিল আল জাজিরা। বলা যায়, বিশ্ব মিডিয়াকে কাঁপিয়ে দেয় আল জাজিরা। প্রিয় পাঠক, বাংলাদেশের মিডিয়াও বিশ্ব বাস্তবতার বাইরে নয়। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি বাস্তবতায় থেকে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে। ঘটনা থেকে পাঠককে বঞ্চিত না করতে। জনগণের স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে। এই প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতার অঙ্গীকার নিয়েই যাত্রা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশ প্রতিদিনের। স্লোগান ছিল- আমরা জনগণের পক্ষে। শুরু থেকে চেষ্টা করেছি পাঠকের ভালোবাসার জবাব বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের মাধ্যমে দেওয়ার। কতটা পেরেছি, কতটা পারিনি তার মূল্যায়নের ভার আপনাদের। আজ বাংলাদেশ প্রতিদিন ষষ্ঠ বর্ষে পদার্পণ করছে। নতুন চ্যালেঞ্জ, নতুন চিন্তার, নতুন অঙ্গীকারের আরেকটি বছর শুরু হচ্ছে। আমাদের সমাজে সবসময় সত্য কথা বলা যায় না। সত্য অনেক কঠিন। আমরা কঠিনকে জয় করতে বিশ্বাসী। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম, সে করে না কখনো বঞ্চনা। কবি নজরুল ধূমকেতু বের করার পর রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, অচেতনদের জাগাবে ধূমকেতু। কবি নজরুল মানুষকে জাগাতেই সংবাদপত্রে যোগ দিয়েছিলেন। মাত্র ২২ বছর বয়সেই কবি গেয়েছেন বিদ্রোহের গান। কবি নজরুলের ধূমকেতু নিষিদ্ধ হয়েছিল। তার সম্পাদিত আরেকটি কাগজও ব্রিটিশদের রক্তচক্ষুকে এড়াতে পারেনি। তবুও নজরুল সেই সময়েই বলেছিলেন, মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু, মুসলমান। নজরুল ইসলামী গানের পাশাপাশি শ্যামা সংগীত লিখেছিলেন। এই যুগে নজরুল তার চিন্তার প্রতিফলন দেখাতে এসে কী অবস্থানে পড়তেন জানি না। তবে গণমাধ্যম সব যুগেই সত্যের পক্ষে। অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে। গণমাধ্যম জানে নিজের দায়িত্বপূর্ণ অবস্থান। চ্যালেঞ্জ নিতে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। আমরা শুরু থেকে আমাদের অবস্থান থেকে একচুল সরে আসিনি। নিরপেক্ষতা, বস্তুনিষ্ঠ অবস্থানে সৎ সাহস নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় মুক্তবুদ্ধির দৈনিক হিসেবে কাজ করছে বাংলাদেশ প্রতিদিন। আমরা সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলতে দ্বিধাহীন। আমরা চাই সুন্দর একটি আগামী। আমরা বিশ্বাস করি বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে। বিশ্বের বুকে মর্যাদার আসনে আমরা। ভৌগোলিক কারণে উন্নত দেশগুলো বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এই দেশটির পরতে পরতে সম্ভাবনা। দক্ষ, দৃঢ় ও স্বাপ্নিক নেতৃত্ব অনেক কিছু বদলে দিতে পারে। গড়ে তুলতে পারে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। তাই দরকার অপশাসন, অনিয়ম, সন্ত্রাস, অব্যবস্থা, সমাজের সব অসঙ্গতিকে দূর করা। আর সব রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বৈষম্য দূর করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ বাংলাদেশ প্রতিদিন। সমাজের মুক্ত বিবেককে জাগ্রত করতে চাই আমরা। এগিয়ে নিতে চাই সামাজিক ন্যায়পরায়ণতা। আমরা বিশ্বাস করি সুশাসনের কোনো বিকল্প নেই। তাই মুক্ত চিন্তা ও বিবেককে জাগিয়ে তোলা জরুরি। সংবিধান, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নে আপসহীন থেকে সব কিছুই করা সম্ভব।

প্রিয় পাঠক, দেখতে দেখতে পাঁচটি বছর চলে গেল। বাংলাদেশে সংবাদপত্রের সংখ্যা প্রায় ১২০০। এর মধ্যে বাংলাদেশ প্রতিদিন নজিরবিহীন সাফল্যের স্বর্ণশিখরে প্রচার সংখ্যায় সবার শীর্ষে। বাংলাদেশ প্রতিদিনের এই সাহসী পথচলার কাণ্ডারি বসুন্ধরা ও ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান। তিনি একজন স্বাপ্নিক মানুষ। সব মানুষই স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু সবাই স্বপ্নকে জয় করতে পারেন না। আহমেদ আকবর সোবহান স্বপ্ন দেখেন, দেখান এবং জয় করেন। বাংলাদেশ প্রতিদিনের যাত্রার শুরুতেই তিনি বলেছিলেন, এই কাগজটির প্রচার সংখ্যা হবে ১০ লাখ। বাংলাদেশের বাস্তবতায় একটি অসম্ভব চিন্তা। কিন্তু তার সেই স্বপ্নই আজ বাস্তব সত্য। বাংলাদেশ প্রতিদিন ষষ্ঠ বর্ষে পদার্পণের দিন আজ প্রকাশিত হলো ৬ লাখ ৫ হাজার। ব্যবসায়িকভাবে লোকসানের চিন্তায় ১০ লাখের ঘরে আমরা এখনো যাইনি। কথা দিচ্ছি ধীরে ধীরে ১০ লাখের ঘর স্পর্শ করব ইনশা আল্লাহ।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে আমরা গভীরভাবে কৃতজ্ঞ বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের প্রতি। একই সঙ্গে কৃতজ্ঞ বসুন্ধরা গ্রুপের কাছে। আমাদের অসম্ভবগুলো সম্ভব হয়েছে বসুন্ধরা গ্রুপের সাহসী বিনিয়োগ, চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের বাস্তবমুখী গাইডলাইন এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে। বিশাল হƒদয়ের মানুষ সায়েম সোবহান বাংলাদেশ প্রতিদিনের পথচলার কোনো কিছুতেই না করেন না। তার সাহসী সিদ্ধান্ত আমাদের উৎসাহ জোগায় পথচলায়। প্রিয় পাঠক, সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ আপনাদের কাছে। একই সঙ্গে সব সম্মানিত বিজ্ঞাপনদাতা, এজেন্ট, মাঠপর্যায়ের বিক্রয় প্রতিনিধি, সংবাদপত্র বিক্রয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত সব ইউনিয়নের নেতাদের কাছেও কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। কৃতজ্ঞতা বাংলাদেশ প্রতিদিনের সব সহকর্মীর প্রতি। শুরু থেকেই সবার আন্তরিক শ্রম, মেধা, ঘামে আজকের এই এগিয়ে চলা।

প্রিয় পাঠক, আমরা দেখতে চাই উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। তাই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে কথা দিচ্ছি, বাংলাদেশ প্রতিদিন অনড় থাকবে তার দৃঢ় অবস্থানে। সব প্রতিকূলতাকে আগামীতেও জয় করবে আপনাদের সঙ্গে নিয়ে। কথা দিচ্ছি, বাংলাদেশ প্রতিদিন আপনাদের চাহিদাকে সামনে রেখেই পথ চলবে। আমরা বাংলাদেশের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা অফুরন্ত সম্ভাবনাকে তুলে আনতে চাই। এগিয়ে নিতে চাই পজেটিভ বাংলাদেশকে। গত বছর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে অঙ্গীকার করেছিলাম নতুনত্বের। এর মধ্যে শুক্রবার প্রকাশ করেছি ফ্রাইডে নামের নতুন একটি ট্যাবলয়েড। মূল পত্রিকার সঙ্গে আরও ৮ পাতা হলেও দাম রেখেছি অপরিবর্তিত ৫ টাকাই। আমাদের অনলাইন ও এসএমএস সার্ভিস এখন দেশে-বিদেশে জনপ্রিয়। আমরা দেশ-বিদেশের অনেক নতুন লেখককে আমাদের সঙ্গে যুক্ত করেছি। নতুন বছরেও পরিবর্তনের অঙ্গীকার পাঠকদের কাছে। এবারও যুক্ত হবে নতুন করে অনেক কিছু। আরও ৮ পাতা প্রকাশ করব শনিবার। এই ৮ পাতাতে থাকবে সম্ভাবনার বাংলাদেশের কথা। দেশ-বিদেশে বাঙালির সাফল্যের কথা। দেশের পাশাপাশি এ বছর বাংলাদেশ প্রতিদিন প্রকাশিত হবে বিদেশের মাটিতেও। প্রবাসীরা এখন এই কাগজটি পড়েন অনলাইনে। আমরা অনলাইনের পাশাপাশি সরাসরি প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছি কয়েকটি দেশে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিদিন প্রকাশিত হবে যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের ওমান থেকে। এ বছর যুক্ত হবেন অনেক নতুন লেখক, কলামিস্ট। পাশাপাশি পাতাগুলোকে আমরা চেষ্টা করব ঢেলে সাজাতে। আশা করছি অতীতের মতোই পাশে পাব আপনাদের।