গল্পের নায়ক কর্নেল মনির

naem nizam:: নঈম নিজাম
আলম ভাইয়ের সঙ্গে দেখা সেদিন। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ভাগ্নে। দারুণ মানুষ। বন্ধুপ্রিয়। সফল ব্যবসায়ী। কথায় কথায় উঠে আসে কর্নেল (অব.) মনিরুল ইসলাম চৌধুরী মুন্নার নাম। তাকে বললাম, আপনার কথা মুন্নার কাছে অনেক শুনেছি। সব সময় বলত, সোহেল তাজকে দেখতাম ছেলের মতো। আর আলম হলো আমার প্রিয় শ্যালক। জবাবে আলম ভাই বললেন, আসলে তাই। আমাকে আদর করতেন তিনি। তার দাপট দেখেছি এরশাদ আমলে। হাঁটাচলাতে কেঁপে উঠত প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের কার্যালয়। মেজর মনির আর মেজর জাহাঙ্গীর দুই বন্ধুই ছিলেন তখন ক্ষমতাবান। বিষয়গুলো আমি জানি। প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক থাকাকালে এরশাদ একবার মনিরকে দিয়ে সিএসপিদের দেশ চালানো নিয়ে গাইডলাইন দেন। বৈঠক শেষে সচিবরা বললেন, মনির বেয়াদব। কিন্তু বলে বেশ ভালো। দেশ নিয়ে তার চিন্তা গভীর। উন্নয়ন-ভাবনা শ্বশুর তাজউদ্দীন আহমদের মতো।

সেই মুন্না ভালো নেই। পুরাতন ডিওএইচএসের বাসায় নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করেন। শরীর অনেক আগে থেকেই খারাপ। কয়েক বছর আগে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে শরীরের একপাশ অবশ হয়ে যায়। আমাকে খবরটি প্রথম জানান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম। সঙ্গে সঙ্গে তাকে দেখতে গিয়েছিলাম সিএমএইচে। অনেক দিন সেখানে ছিলেন। কথা বলতে পারতেন না। তারপর মিরপুর ও সাভারে দীর্ঘ চিকিৎসা। অবশ শরীর এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। বছরখানেক আগে দেখে এসেছিলাম। তারপর আর যেতে পারিনি কর্মব্যস্ততায়। সর্বশেষ শুনেছি একটু একটু কথা বলতে পারেন। কিন্তু বড় নিঃসঙ্গ তার জীবন। আপনজনদের থেকে অনেক দূরে। স্ত্রী শারমিন আহমদের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছিল আওয়ামী লীগের ‘৯৬ মেয়াদে। কয়েক দিন কারাভোগও করতে হয়েছিল। মুন্না আর বিয়েশাদি করেননি। শারমিন বিয়ে করেছেন মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের এক নেতাকে, যিনি থাকেন ওয়াশিংটনে। শারমিনও থাকেন সেখানে। অতিসম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধ ও তাজউদ্দীন আহমদকে নিয়ে বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা দুটোই আছে। একসময় কর্নেল মনির নিজেও থাকতেন ওয়াশিংটন। সেখানে তার বাড়ি ছিল। ব্যবসা-বাণিজ্য, সম্পদ ছিল। ছাড়াছাড়ির পর আমেরিকার আইন অনুযায়ী স্ত্রীকে সব বুঝিয়ে দিতে হয়েছে। ঢাকার বারিধারার বাড়িটি ছেলে বিক্রি করে দিয়েছে। তারপর শুধু একটি ফ্ল্যাট পুরাতন ডিওএইচএসে।

ছেলেমেয়েকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন মুন্না ভাই। ছাড়াছাড়ির পর মেয়ের সঙ্গে আর দেখা হয়নি। শারমিন মেয়ের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেন তাকে। ছেলে বাবার সঙ্গে বারিধারার একটি ফ্ল্যাটে কিছুদিন ছিল। ছেলেটি দেখতে বাবার মতো সুন্দর। শুনেছি বিয়েশাদি করেছে। তার পরের অনেক কিছু জানি না। সন্তানদের জন্য তার চোখে অশ্রু আমি দেখেছি। বিশেষ করে মেয়ের জন্য। মুন্নাকে শারমিন ছাড়েন অন্য এক নারীর সঙ্গে সম্পর্কের কারণে। ছাড়াছাড়ির অল্প কিছুদিনের মধ্যে শারমিন বিয়ে করেন। কিন্তু মুন্না আর বিয়েশাদি করেননি। মেধাবী এই মানুষটি নিজেকে কাজে লাগাতে পারলেন না। এক ধরনের অস্থিরতায় ভুগতেন। সংসার বিচ্ছিন্নের পর মুন্না হারিয়ে গেলেন। জেগে উঠলেন শারমিন। ইতিহাস নিয়ে বই লিখে জনপ্রিয় হয়ে গেলেন। অথচ ইতিহাস ছিল অন্য রকম। মনিরুল ইসলাম চৌধুরী মুন্নাকে এক নামে সবাই চিনত। জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু সব সময় বলতেন, দুনিয়ার বেশির ভাগ মানুষের কাছে জ্ঞান নেওয়ার কিছু নেই। কিছু মানুষের কাছে আছে। মনির তাদের একজন। এরশাদ শাসনামলের অবসানের পর টিংকু, জিল্লুর রহিম দুলাল, মেজর (অব.) জাহাঙ্গীরসহ আমরা একসঙ্গে আড্ডা দিয়েছি। কোথায় যেন হারিয়ে গেছে সেই সব আড্ডা।

মুন্নাকে এরশাদ পছন্দ করতেন। আর করতেন বলেই ‘৮২ সালে সামরিক শাসনের পর তাকে সঙ্গে রাখেন। আমার সঙ্গে তার পরিচয় ‘৯০ সালের দিকে। তখন মুন্না ব্যস্ত এরশাদের পতন চিন্তায়। সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের কয়েকজন নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন টিংকুর বাসায়। এরই মধ্যে একদিন পরিচয় করিয়ে দেন জিল্লুর রহিম দুলাল। প্রথম দেখাতেই মনে রাখার মতো মানুষ। ভীষণ দাপুটে ছিলেন সামরিক শাসন জারির পর। এরশাদ ও জেনারেল চিশতি অনেক বিষয়ে মুন্নার ওপর নির্ভর করতেন। ‘৮৪ সালের শেষ দিকে জেনারেল চিশতির সঙ্গে ভুল-বোঝাবুঝি হয় এরশাদের। জেনারেল এরশাদ তার সচিবালয়ের দাপুটে কর্তা মুন্নাকে পাঠিয়ে দেন ওয়াশিংটন দূতাবাসে মিনিস্টার করে। এই পদেই ওয়ান-ইলেভেনের পর নিয়োগ পান ব্রিগেডিয়ার বারী।

পড়ন্ত যৌবনে ২০০৪ ও ২০০৬ সালে মুন্নার সঙ্গে ওয়াশিংটনে অনেক ঘুরেছি। ২০০৬ সালের বিষয়টি ছিল আলাদা। কারণ আমি ছিলাম স্টেট ডিপার্টমেন্টের অতিথি। এপ্রিল মাস জুড়ে টানা তিন সপ্তাহের কর্মসূচি। আমার সঙ্গে হাসনাইন খোরশেদ। সাউথ এশিয়ার সাত সাংবাদিক। বাংলাদেশ থেকে দুজন। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত টানা কর্মসূচি। এর মধ্যে পেন্টাগন ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের বৈঠকগুলো ছিল খুবই স্মরণীয়। এখনো মনে আছে পেন্টাগনের কিছু স্মৃতি। এপ্রিলের এক দুপুুরে পেন্টাগনে প্রবেশের করিডর-৫-এ আমাদের গাড়ি থামে। সঙ্গে স্টেট ডিপার্টমেন্টের একাধিক কর্মকর্তা। আগে থেকে নির্দেশ ছিল পাসপোর্টসহ সব কাগজপত্র সঙ্গে রাখার। এর পরও ভুল করে কেউ একজন তা আনেননি। গেটের সামনে গাড়ি দাঁড়াতেই যেন কঠোর নিরাপত্তা বূ্যহে প্রবেশ করলাম। ডগ স্কোয়াড লেগে গেল গাড়ি তল্লাশিতে। গাড়ি থেকে নেমে স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তা এলিজাবেথ এম গোমেজ ও জন ক্রিস্টোফার কিং নিজেদের পরিচয় দেন। আমাদের নামের তালিকা গেটেই ছিল। এর পরও তল্লাশি। পাসপোর্ট পরীক্ষা করা হয়। শরীর তল্লাশি করা হয় কয়েক দফা। তারপর মেলে প্রবেশের অনুমতি। মূল গেট থেকে প্রবেশের পর আরও কঠোর নিরাপত্তা। সব শেষে বিমান ও সেনাবাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তা আমাদের স্বাগত জানান। অভ্যর্থনা জানান ফরেন ভিজিটর লিয়াজোঁ অফিসার জেনেট ওয়েবার। জেনেট আমাদের জানান পেন্টাগনে সিরিজ বৈঠকের কথা। সব শেষে থাকবে ১১ সেপ্টেম্বর আল-কায়েদার হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থান পরিদর্শন। সাউথ এশিয়ান অ্যাফেয়ার্স ডেস্কের পরিচালক ক্লডিও লিলেনফিল্ড কথা শুরু করেন। এরপর ব্রিফিং করতে আসেন আরও দুজন। তারা হলেন ইউএস আর্মির প্রেস অফিসার লে. কমান্ডার মার্ক ব্যালেসটেরোস ও ন্যাশনাল পাবলিক রেডিওর পেন্টাগন করেসপনডেন্ট জন হেনড্রেন। আলোচনা জমে ওঠে পরিচালক ক্লডিও লিলেনফিল্ডের সঙ্গে। সাউথ এশিয়াকে নিয়ে আমেরিকানদের সামরিক, রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার পাশাপাশি ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের বিষয়ে খোলামেলা প্রশ্ন করি আমরা। হাসনাইন খোরশেদ প্রশ্ন করেন ওসামা বিন লাদেনকে নিয়ে। হাসনাইন বলেন, অনেকে মনে করেন ওসামাকে আমেরিকা লুকিয়ে রেখেছে। মোটেও ক্ষুব্ধ হলেন না পেন্টাগন কর্মকর্তা। বরং সহজভাবে এ প্রশ্নের জবাব দিলেন। বললেন, এ ধারণা মোটেও ঠিক নয়। ওসামা বিন লাদেন শুধু আমেরিকা নয়, বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানুষের শত্রু। তাকে আমেরিকা অবশ্যই গ্রেফতার করবে। অপেক্ষা করো।

ক্লডিও লিলেনফিল্ড জেডএলবি পেন্টাগনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাধর ব্যক্তি। আমাদের সঙ্গে বৈঠক চলাকালে তাকে জরুরি কারণে কয়েক দফা উঠে গিয়ে ফোন ধরতে হয়েছিল। আমেরিকানরা কারও সঙ্গে বৈঠকে এটি করেন না। একপর্যায়ে তাকে কোনো বিষয়ে চিন্তিত মনে হলো। তিনি আমাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে অন্য সহকর্মীকে ব্রিফিং বুঝিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। লে. কমান্ডার মার্ক ব্যালেসটেরোস ইরাক যুদ্ধ নিয়ে সাংবাদিকরা কীভাবে কাজ করছেন তা তুলে ধরলেন। তার সঙ্গে সবার আরেক চোট হলো। আমেরিকান সাংবাদিকরা ইরাক নিয়ে সঠিক তথ্য মিডিয়াতে তুলে ধরছে না বলেও আমরা অভিযোগ তুললাম। যুদ্ধের ময়দানে পেন্টাগনের দেওয়া সাংবাদিকতাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়াগুলো করছে কি না তাও জানতে চাইলাম। তারা হেসে উত্তর দিলেন- ঠিক নয়। বৈঠক শেষে পেন্টাগন ভবনের ভেতরে মাইলখানেক হেঁটে গেলাম ১১ সেপ্টেম্বর হামলার স্থানে। দর্শনার্থী বইয়ে আমি আর হাসনাইন বাংলায় লিখলাম শোক ও কষ্টের অনুভূতির কথা। কলকাতার আজকালের চিফ রিপোর্টার মধুমিতা দত্তও আমাদের মতো বাংলায় শোকের কথা লিখলেন। ‘নিরপরাধ মানুষদের জিম্মি করে হত্যা সভ্য জগতের এক অসুস্থ বর্বরতা। এই নৃশংসতা বর্বরতার বিরুদ্ধে বিশ্বকে রুখে দাঁড়াতে হবে। এমন নিষ্ঠুরতা দেখতে চাই না।’

ওয়াশিংটনে সেবার আমরা পৃথিবীর আরেকটি ক্ষমতাধর অফিস স্টেট ডিপার্টমেন্টেও গিয়েছিলাম। স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিশাল ক্যান্টিনে লাইনে দাঁড়িয়ে সবাইকে খাবার নিতে দেখলাম। দেখলাম দুনিয়া চালানো টপ বসেরা লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার নিচ্ছেন। বিল শোধ করছেন। স্টেট ডিপার্টমেন্টে কথা হয় ব্যুরো অব সাউথ অ্যান্ড সেন্ট্রাল এশিয়ান অ্যাফেয়ার্সের প্রেস অ্যান্ড পাবলিক ডিপ্লোমেসি উপ-পরিচালক মি. লেন সেন্সনাই, কান্ট্রি অ্যাফেয়ার্স অফিসার মিজ লেইল কুয়্যুমসু, প্রেস অফিসার মি. রবার্ট প্যালাডিনোর সঙ্গে। দীর্ঘ বৈঠক ছাড়াও আমরা সেখানকার নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে অংশ নিই। সিএনএনসহ বিভিন্ন টেলিভিশন এই ব্রিফিং লাইভ সম্প্রচার করে। সেদিন ব্রিফিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন কার্ল টি রোয়ান। ইরাকের সর্বশেষ যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে তিনি ব্রিফ করছিলেন। আমাদের আগেই জানানো হয় কোনো প্রশ্নোত্তরে অংশ নিতে পারব না। শুধু কীভাবে ব্রিফিং করা হয় এবং টেলিভিশনগুলো কীভাবে তা সম্প্রচার করে তা দেখতে পাব। বিভিন্ন টেলিভিশনের লাইভ সম্প্রচারের কারিগরি দিকসমূহ ব্রিফিংয়ের আগে আমাদের দেখানো হয়। স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমাদের বৈঠকটি দারুণ জমে ওঠে। পাকিস্তানি সাংবাদিক মহসিন রাজা খান ও হাসান খান জানতে চান পাকিস্তানের সামরিক শাসন সম্পর্কে। জেনারেল পারভেজ মোশাররফকে আমেরিকা কত দিন ক্ষমতায় রাখবে তারা তা নিয়ে প্রশ্ন করেন। বন্ধু হাসান খান কট্টর ভাষায় জানতে চান, আমেরিকা গণতান্ত্রিক দেশ বলে গর্ব করে অথচ পাকিস্তানের মতো দেশে বারবার সামরিক শাসনকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। এই দ্বিমুখী নীতি কেন? মার্কিন পেশাদার কূটনীতিকরা তাদের স্বভাবসুলভ জবাব দেন- আমেরিকা সর্বদা গণতন্ত্রের পক্ষে। পাকিস্তান তার নিজের মতো চলছে। তবে আফগানিস্তান পরিস্থিতির আলোকে পাকিস্তানের বিষয়ে অনেক কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে তারা স্বীকার করেন। এখানে একটি মজার প্রশ্ন করেন মহসিন রাজা। তার প্রশ্নটি ছিল পাকিস্তানে পারভেজ মোশাররফের সামরিক শাসন জারির সময় প্রেসিডেন্ট বুশের মিডিয়া ব্রিফ নিয়ে। একজন সাংবাদিক বুশকে প্রশ্ন করেছিলেন, পাকিস্তানে পারভেজ মোশাররফের সামরিক শাসনে বুশের ইন্ধন আছে কি না। জবাবে বুশ বলেছিলেন, ‘হু ইজ পারভেজ মোশাররফ?’ সামরিক শাসন নিয়ে জানি না কিছুই। এ সময় তিনি তার প্রেস সেক্রেটারির সঙ্গেও কথা বলেন। মহসিনের এ প্রশ্নের জবাবে স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তা বলেন, সামরিক শাসন জারি হচ্ছে এই বিষয়টি প্রেসিডেন্টের অজানাও থাকতে পারে। ভুল বোঝার অবকাশ নেই। পাকিস্তানের সাংবাদিক বন্ধুরা এই জবাবে খুশি হতে পারেননি। তাদের মতে, পাকিস্তানে সামরিক শাসনে সব সময় যুক্তরাষ্ট্রের হাত থাকে।

ওয়াশিংটনে টানা কয়েক দিনের কর্মসূচিতে আমরা ক্লান্ত। এক সন্ধ্যায় হাসনাইনকে বললাম, ডাল-ভাত খেতে ইচ্ছে করছে। হাসনাইনও আমার সঙ্গে একমত। ফোন করলাম কর্নেল মনিরকে। মনির ছুটে এলেন আমাদের হোটেলে। বললেন, চলো। আমরা দুজন তার গাড়িতে। তিনি ড্রাইভ করছেন। পাশে আমি। পেছনে হাসনাইন। রাত ১১টায় এক রূপবতী নারী আমাদের আমন্ত্রণ জানালেন। বললেন, আমি আল্পনা চৌধুরী। রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে বাংলাদেশের ডাল, ভাত, মাছ। আলাপে আলাপে জানলাম, সুন্দরী এই রমণী নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিবিদ বাচ্চুর পত্নী। নৃশংসভাবে বাচ্চুকে হত্যা করা হয়েছিল। আলোচিত সেই হত্যার বিচার পাননি বলে অভিযোগ করেন আল্পনা। তার আরেকটি পরিচয় তিনি ব্যবসায়ী সিনহার স্ত্রীর বোন। পরিপাটি গোছানো বাড়ি। মেয়েকে নিয়ে থাকেন মিসেস চৌধুরী। কথায় কথায় রবীন্দ্রের উপমা। রাতের খাবারটি জমে ওঠে। মধ্যরাতে মুন্না আমাদের নামিয়ে দেন হোটেলে। এর মধ্যে হাসনাইন জমিয়ে তোলেন মুন্নার সঙ্গে। আমি তাকে মুন্নার কিছু ঘটনা বললাম। তথ্য ক্যাডারের সাবেক কর্মকর্তা আবু তৈয়বের কাছে শোনা একটা ঘটনা জানালাম তাকে। আবু তৈয়ব আমাকে বলেছিলেন, বিসিএস পাস করেন তারা সামরিক শাসনের আগে। কিন্তু সামরিক শাসনের পর এ নিয়োগ থেমে যায়। শক্তিধর সিএসপি তথ্যসচিব সামরিক শাসনের অজুহাতে তাদের নিয়োগ বন্ধ করে দেন। তখন তারা সিএমএলএ সচিবালয়ে গিয়ে দেখা করেন স্টাফ অফিসার মেজর মনিরের সঙ্গে। মনির তাৎক্ষণিক ফোন করেন তথ্যসচিবকে। বলেন, নিয়োগ এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। যারা আগে বিসিএস পাস করেছে তাদের কেন বাদ দেওয়া হবে? আজই আপনি তাদের নিয়োগের ব্যবস্থা করবেন। কাল বলে কোনো কথা শুনতে চাই না। একজন মেজরের নির্দেশ সেদিনই বাস্তবায়ন হয়েছিল। সচিবালয়ে মেজর মনিরের ফোন তখন আতঙ্কের মতো ছিল। কোনো কিছু বাস্তবায়ন না করে উপায় ছিল না কারও। এরশাদের প্রথম মন্ত্রিসভা গঠনেও তার ভূমিকা ছিল।

লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন