একটি হাসপাতালের মৃত্যু কাহিনী

কুমিল্লা নাঙ্গলকোটের গোহারুয়া আমার গ্রাম। আমি একটি হাসপাতাল। সরকারি অর্থ ব্যয়ে আমাকে নির্মাণ করা হয়েছিল। এই নির্বাচনী এলাকার মাননীয় এমপি এখন সরকারের প্রভাবশালী পরিকল্পনা মন্ত্রী। আমার নির্মাণ হয় বিএনপির আমলে। নির্মাণ শেষ হতেই বিএনপির বিদায়। এরপর ক্ষমতায় আসে ওয়ান-ইলেভেন সরকার। সেই সরকারটির কাজ ছিল জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দেওয়া, আর রাজনীতিবিদদের জেলে ঢোকানো। তাই আমার দিকে দৃষ্টি দেওয়ার সময় তাদের ছিল না। ওয়ান-ইলেভেন শেষে আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। ভাবলাম এবার আমার গতি হবে। ডাক্তার আসবে। নার্স আসবে। রোগীরা ভিড় জমাবে। ৩২ শয্যায় সবসময় রোগী থাকবে। ইনডোর, আউটডোর থাকবে জমজমাট। কিন্তু দিন যায়, মাস আসে। দেখতে দেখতে বছরও শেষ হয়ে যায়। আমার কিছু হয় না।

স্থানীয় এমপি আ হ ম মুস্তফা কামাল (লোটাস কামাল) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠান। কিন্তু তখনকার ডাক্তার মন্ত্রী ব্যস্ত ছিলেন নিজের আয়-রোজগার নিয়ে। আমাকে নিয়ে তার চিন্তার সময় কোথায়! সেই মন্ত্রী তার নিজের জেলা নিয়েও ভাবতেন না। তার এলাকা জামায়াত দখল করে নিয়েছিল। বাস্তবতার বাইরে ছিলেন মানুষটা। এখন মন্ত্রিত্ব নেই তার। পুরান সরকার, নতুন করে ক্ষমতায়। নতুন করে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এসেছেন। মন্ত্রী আবার দক্ষ রাজনীতিবিদ। তার বাবাও দাপুটে মন্ত্রী ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে রয়েছে বিশাল অবদান। নতুন মন্ত্রী পেয়ে আশার আলো দেখতে পাই। অবশ্য এই আশার আলোর কারণ একজন সাংবাদিক। তিনি আবার এই গ্রামের বাসিন্দা। বাড়ি এলে এলাকার মানুষ তার কাছে ছুটে যান। তিনিও মানুষের সমস্যার কথা শোনেন। কাজের কাজ কিছু হয় কি না জানি না। আমি সাংবাদিকের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছি। তিনি বলেছেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কটা অনেক দিনের। বলা যায় তিন দশকের। মোহাম্মদ নাসিম যখন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক তখন নিয়মিত কথা হতো। কাজ করতাম আজকের কাগজ, ভোরের কাগজে। প্রতিদিন তিনি ফোন করতেন। আমিও করতাম। তার বাসায় যেতাম। ’৯৬ সালে মন্ত্রী থাকাকালে কম গেছি। প্লট, টেলিফোন কোনো কিছু নিইনি। তবে সম্পর্ক ভালো ছিল। একবার নাঈমুল ইসলাম খানকে নিয়ে যাই। আরেকবার ক্রাইম রিপোর্টার আমিনুর রহমান তাজের সঙ্গে মন্ত্রীর সম্পর্কের অবনতি হয়। মন্ত্রী ক্ষুব্ধ ছিলেন। তিনি তখন পুলিশ মন্ত্রী। তাজকে সরাসরি মন্ত্রীর হেয়ার রোডের বাড়িতে নিয়ে যাই। মন্ত্রী তাকে আটক করলেন না। আমার কথা শুনে, তাজকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন। পুলিশ আর তাজের সঙ্গে ঝামেলা করেনি। ২০০১ সালের পর এই মন্ত্রীকে নিয়ে রাজনৈতিক সভাও করেছি কুমিল্লার বাগমারা এবং টাউন হল মাঠে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মন্ত্রীর বাড়িতে গিয়েছিলাম। রাতে ডিনার খেয়েছিলাম বন্ধু সহকর্মী পীর হাবিবুর রহমানসহ। ভাবী খাবার তুলে দেন পাতে। ভাবী ও জয়ের সামনেই হাসপাতাল নিয়ে কথা হয়। মন্ত্রী অঙ্গীকার করেছিলেন, হাসপাতালটির এবার চিকিৎসা হবে। ডাক্তার-রোগী সব আসবে। এই হাসপাতাল আর অসুস্থ থাকবে না। সাংবাদিক আরও বললেন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একটি কবিতা লিখে গেছেন, ‘কেউ কথা রাখেনি’। সাংবাদিকের কথা ঠিক। এক বছর কেটে গেছে। এখানে মন্ত্রীর কোনো দোষ নেই। দোষ কবিতার। সাংবাদিক আশাবাদী। কিন্তু কবিতা নিয়েই বিপত্তি।

এই সাংবাদিকের সঙ্গে আবার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সম্পর্কটাও ভালো ছিল। এখন সুনীল নেই। রয়ে গেছে তার কবিতা। তাই কারও মনে নেই আমার কথা। কবিতাটি না থাকলে এত দিনে আমারও চিকিৎসা হতো। পরিকল্পনামন্ত্রীও আশ্বস্ত করেছেন, এবার হবেই হবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু কারও কথায় আর বিশ্বাস, আস্থা রাখতে পারছি না। মন্ত্রী, এমপি, সাংবাদিক কারও কথাই ভালো লাগছে না। কারণ আমার স্বাস্থ্যের অবস্থা ভালো নয়। যক্ষ্মা রোগীর মতো দিন দিন শরীর-মন ক্ষয়ে পড়ছে। এলাকাবাসী এখন আর আমাকে হাসপাতাল নামে ডাকে না। তারা বলে, ভূতের বাড়ি। মানুষকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। ধ্বংসের কিনারে দাঁড়িয়ে আছি। যে কোনো সময় চিরতরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ব। মৃত্যুর আগে ভাবছি আমার জন্মদাতা বাংলাদেশ সরকারকে নিয়ে। যেই সন্তানের লালন-পালন করতে পারবে না সেই সন্তান জন্ম দেওয়ার কী দরকার ছিল? রাষ্ট্রের কোষাগারের অর্থ অপচয়ের অধিকার তাদের কে দিয়েছে? ওসব প্রশ্নও কাউকে করা হয় না। মৃত্যুশয্যা থেকে ওসব প্রশ্ন করা যায় না।