অস্ত্রের লাইসেন্স আমি পাইনি, পেয়েছিলেন নূর হোসেন

montobbo protibedon:: নঈম নিজাম
কুমিল্লার জেলা প্রশাসক ছিলেন আবদুল মালেক। তিনি এখন সরকারের অতিরিক্ত সচিব, পোস্টিং প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-১। জেলা প্রশাসক থাকাকালে তিনি আমাকে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্য করেন। আমি দুই-তিনটি বৈঠকে যোগও দিয়েছিলাম। পরে আর যেতে পারিনি। যোগ দিয়েছিলাম অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য। ধারণা হলো জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির কাজ সম্পর্কে। এর মধ্যে একদিন জেলা প্রশাসক বললেন, আপনার অস্ত্রের লাইসেন্স আছে কি? আমি বললাম নেই। তিনি বললেন, নিয়ে নেন। বন্দুক, শর্টগান জাতীয় অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার এখতিয়ার আমার আছে। পিস্তল, রিভলভার হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যাবে। আমি জেলা প্রশাসক বরাবর পিস্তলের লাইসেন্সের জন্য আবেদন জমা দেই। তিনি তদন্তের জন্য পাঠালেন পুলিশের কাছে। পুলিশের বিভিন্ন শাখা আমার সব কাগজপত্র নিল, পরীক্ষা করল। অস্ত্রের লাইসেন্সের জন্য একজন নাগরিকের যত কাগজ দরকার সব দিলাম। এর বাইরে পেশাজীবী পরিচয় তো আছেই। পুলিশের দুটি বিভাগ সব পরীক্ষা করল। তারপর সব ঠিক আছে বলে ইতিবাচক রিপোর্ট দিয়ে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পাঠিয়ে দিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। এর মধ্যে জেলা প্রশাসক আবদুল মালেক ফোন করলেন। বললেন, আমি আর বেশি দিন কুমিল্লায় নেই। আপনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে একটু যুগ্ম সচিব রাজনৈতিক এর সঙ্গে দেখা করুন। ওখানে দেখা না করলে ফাইল আটকে রাখে। আমি গেলাম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। পথে দেখা যুব লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মনজুরুল আলম শাহিনের সঙ্গে। তিনি এখন কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক।

আরেকজন ছিলেন শাহিনের সঙ্গে। তার নাম মনে পড়ছে না। যুগ্ম সচিব ভদ্রলোকের বাড়ি ফেনী মাস্টার পাড়া। তিনি শাহিনের পূর্ব পরিচিত। আমার সঙ্গে পরিচয় হলো। তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন আমি ট্যাঙ্ দেই কি না। আমি বললাম, লাইসেন্সের জন্য যে পরিমাণ ট্যাঙ্ দিতে হয় আমি তার চেয়ে অনেক বেশি দেই। তা ছাড়া দেশের একজন সিনিয়র সাংবাদিক হিসেবে আবেদন করেছি। তিনি গম্ভীর ভাব নিলেন। কথায় কথায় বললেন, তার মামাশ্বশুর ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর। ফেনীতে তারা হাজারী পরিবারের ঘনিষ্ঠ। আরও অনেক কিছু। আমি শুনে গেলাম। বললাম, আমার লাইসেন্সটি হবে কি? তিনি বললেন, দেখা যাক। এর মধ্যে আমার স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমিন ফোন করলেন। তিনিও একজন সিনিয়র সাংবাদিক। কোথায় আছি জানতে চাইলেন। বললাম, অস্ত্রের লাইসেন্স নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তদবির করতে এসেছি। শুনে জ্বলে উঠলেন গৃহিণী। বললেন, ওসব দরকার নেই তোমার। জীবন, মৃত্যুর মালিক আল্লাহ। লাইসেন্স দিয়ে কী হবে? গৃহিণীর ভয়ে কুমিল্লায় আর খোঁজ নেই না। তবে কৌতূহলবশত আমার এক রিপোর্টারকে বললাম, অস্ত্রের দরকার নেই। আমার লাইসেন্স হলো কি না একটু খোঁজ নাও। রিপোর্টার তদন্ত করে জানাল, যুগ্ম সচিব রাজনৈতিক কারণ দেখিয়ে আমার লাইসেন্সের আবেদন নাকচ করেছেন। মনে মনে শান্তি পেলাম। অস্ত্রের লাইসেন্স নিয়ে সংসারে অশান্তির দরকার নেই। এমনিতে ভালো আছি। কিন্তু আবার মনে হলো, লাইসেন্স পাওয়া মানে অস্ত্র কেনা নয়। আমি পেলাম না। অস্ত্রের লাইসেন্স তাহলে কারা পায়?

খোঁজ নিয়ে আরেক দফা চমকে ওঠলাম। আওয়ামী লীগের আগের মেয়াদের যুগ্ম সচিব রাজনৈতিক ব্যক্তি, বিএনপি এবং ওয়ান-ইলেভেনের সময়ও একই দায়িত্বে ছিলেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছাড়া অন্য মন্ত্রণালয় তার ভালো লাগে না। সব আমলেই তিনি একই পদে থাকেন। বিএনপির আমলে আত্দীয় বানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থি একজন শিক্ষক নেতাকে। আওয়ামী লীগ আমলে ড. আলমগীরের আত্দীয় হন। আমাকে অস্ত্রের লাইসেন্স দেননি, সমস্যা নেই। অস্ত্র কারা পায়? অস্ত্রের লাইসেন্স পায় নারায়ণগঞ্জের নূর হোসেনরা। ৮০ ভাগ দেওয়া হয় রাজনৈতিক বিবেচনায়। রাজনৈতিক দলের ছাত্র, যুব ক্যাডারদের থাকে অগ্রাধিকার। ওরা লাইসেন্স রিনিউ করান না। পুরনো অস্ত্রটি অবৈধ হয়ে যায়। তারা অস্ত্রটি রেখে দেন। এই অবৈধ অস্ত্রের পাশাপাশি আরেকটি লাইসেন্স নেন। বৈধ ও অবৈধ অস্ত্র দিয়ে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি করেন। পাড়ার সন্ত্রাসী অপরাধী, খুনের মামলার আসামিকেও অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় অস্ত্রের লাইসেন্স পেয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের নূর হোসেন। একাই ১১টি অস্ত্রের লাইসেন্স পেয়েছিলেন। সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নূর হোসেনরা অস্ত্রের লাইসেন্সে এগিয়ে আছে। এখানে লেনদেন হয়ও বড় মাপের। ব্যবসায়ী ও অন্যরা কিছু লাইসেন্স পান। আসলে অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে ভালো নীতিমালা নেই, যা আছে তার অপব্যবহার করেন কর্মকর্তা নিজেরাই। তারা ব্যস্ত থাকেন নূর হোসেনদের নিয়ে। এখানে আমাদের মতো মানুষদের ঠাঁই নেই।